পিজি হাসপাতালের সিজারিয়ান ডেলিভারির গাইডলাইন – Cesarean Section

Gynae Operation - BMU Hospital - Sochip Health
আপনার পরিবারের কারো উপকারের জন্য পোস্টটি শেয়ার করে দিন

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা পিজি হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগ, বাংলাদেশের সবচাইতে নিরাপদ এবং আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর একটি। বিশেষ করে সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে এখানকার চিকিৎসকদের দক্ষতা এবং আধুনিক সুযোগ সুবিধা বিশ্বমানের। একজন গর্ভবতী মা এবং তার পরিবারের জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিএমইউ বা পিজি হাসপাতালে সিজারিয়ান চিকিৎসা পদ্ধতি, ভর্তির নিয়ম এবং আনুমানিক খরচ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত গাইডলাইন তুলে ধরা হলো।

০১। গাইনী বিভাগের অবস্থান এবং প্রাথমিক ধাপ

পিজি হাসপাতালে গাইনী ও প্রসূতি সংক্রান্ত অধিকাংশ সেবা মূলত সি ব্লক এবং ডি ব্লকে প্রদান করা হয়। আপনি যদি প্রসূতি সেবা নিতে চান তবে আপনাকে প্রথমে হাসপাতালের বহির্বিভাগ বা আউটডোরে ডাক্তার দেখাতে হবে। শাহবাগ মোড় সংলগ্ন গেট দিয়ে প্রবেশ করে টিকেট কাউন্টার থেকে মাত্র ৩০ টাকার বিনিময়ে গাইনী বিভাগের টিকেট সংগ্রহ করতে হবে। আউটডোর সেবা প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে। এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা গর্ভবতী মায়ের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।

০২। সিজার বা অপারেশনের সিদ্ধান্ত

নিয়মিত চেকআপের সময় যদি দেখা যায় যে স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি সম্ভব নয় কিংবা মা ও শিশুর জীবনের ঝুঁকি রয়েছে তবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সিজারের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তটি সাধারণত গর্ভধারণের শেষ দিকে নেওয়া হয়। তবে জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো সময় সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রয়োজন হতে পারে। ডাক্তার যখন সিজারের তারিখ নির্ধারণ করেন তখন তিনি রোগীকে ভর্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট স্লিপ বা ফরম প্রদান করেন।

০৩। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা

অপারেশনের আগে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করার জন্য বেশ কিছু ল্যাব টেস্ট করা বাধ্যতামূলক। যাকে বলা হয়, অপারেশনের জন্য ফিটনেস টেস্ট। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রক্ত পরীক্ষা বা সিবিসি এবং ব্লাড গ্রুপিং। এছাড়া রক্তের সুগার বা ডায়াবেটিস পরীক্ষা এইচবিএসএজি এবং ইউরিন টেস্ট করা হয়। শিশুর অবস্থান এবং স্বাস্থ্য বুঝতে আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং মায়ের হার্টের অবস্থা বুঝতে ইসিজি করা প্রয়োজন হতে পারে। এই সব পরীক্ষার রিপোর্ট সঠিক থাকলেই কেবল সার্জন সিজারিয়ান ডেলিভারির চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেন। এই পরীক্ষাগুলো হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে করা সম্ভব।

০৪। ভর্তির নিয়মাবলী এবং প্রক্রিয়া

পিজি হাসপাতালে ভর্তির প্রক্রিয়াটি ডাক্তারের রিকমান্ডেশন অনুযায়ী অত্যন্ত সহজ ও সুশৃঙ্খল। বহির্বিভাগের ডাক্তার যখন ভর্তির পরামর্শ দেন তখন রোগীকে সি ব্লকের নিচতলায় অ্যাডমিশন কাউন্টারে যেতে হয়। সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ অগ্রিম টাকা জমা দিয়ে বেড বা কেবিন বরাদ্দ নিতে হয়। হাসপাতালে মূলত দুই ধরণের এডিমিশন বা থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। একটি হলো জেনারেল ওয়ার্ড যেখানে অনেক রোগীর সাথে থাকতে হয় এবং খরচ অনেক কম। অন্যটি হলো কেবিন ব্লক যেখানে রোগীদের জন্য আলাদা একটি কক্ষের সুবিধা থাকে। কেবিনের জন্য আগে থেকে সিরিয়াল দিয়ে রাখা ভালো কারণ সেখানে আসন সংখ্যা সীমিত।

Blog image BMU - C Block - PG Hospital
BMU – C Block – PG Hospital

০৫। সিজারিয়ান চিকিৎসার পদ্ধতি

ভর্তির পর রোগীকে অপারেশনের আগের রাতে বা কয়েক ঘণ্টা আগে নির্দিষ্ট প্রস্তুতিমূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়। পিজিতে সিজারিয়ান ডেলিভারি সাধারণত অত্যন্ত দক্ষ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিমের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

অপারেশনের সময় মেরুদণ্ডে ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরের নিচের অংশ অবশ করা হয় অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অজ্ঞান করা হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটি আধুনিক অপারেশন থিয়েটারে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা হয়, যাতে সংক্রমণ বা অন্য কোনো জটিলতা না ঘটে।

BMU - PG Hospital Operation theatre
BMU Operation theatre
BMU - PG Hospital Operation theatre 2

০৬। নবজাতকের বিশেষ যত্ন ও এনআইসিইউ সুবিধা

পিজি হাসপাতালের সবচাইতে বড় সুবিধা হলো এখানে সিজারিয়ান ডেলিভারির পর যদি নবজাতকের কোনো শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দেয়, তবে তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার জন্য এনআইসিইউ বা নবজাতক নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে এই সুবিধা থাকে না, ফলে জরুরি অবস্থায় শিশুকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয় যা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু পিজিতে একই ছাদের নিচে মা ও শিশু উভয়ের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

BMU - Super Specialized Hospital
BMU – Super Specialized Hospital

০৭। চিকিৎসার খরচ সংক্রান্ত গাইডলাইন

সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে সিজারিয়ান ডেলিভারির খরচ অন্যান্য বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতালের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী। নিচে একটি আনুমানিক খরচের ধারণা দেওয়া হলো।

ক। ভর্তির ফি এবং বেড ভাড়া – জেনারেল ওয়ার্ডে থাকলে প্রতিদিনের খরচ খুবই সামান্য যা কয়েকশ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কেবিনের ক্ষেত্রে ভাড়া প্রতিদিন ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে হতে পারে।

খ। অপারেশন বা সার্জন ফি – সরকারি এই হাসপাতালে সার্জারি ফি এবং অ্যানেস্থেসিয়া ফি বেসরকারি ক্লিনিকের তুলনায় কয়েক গুণ কম। সাধারণত ৫০০০ থেকে ১০০০০ টাকার একটি প্যাকেজ বা খরচের মধ্যে অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়।

গ। ওষুধের খরচ – অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ এবং স্যালাইন হাসপাতাল থেকেই সরবরাহ করা হয়। তবে বিশেষ কিছু দামি ওষুধ বা ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনতে হতে পারে যার জন্য ৫০০০ থেকে ৭০০০ টাকা হাতে রাখা ভালো।

ঘ। ল্যাব পরীক্ষা – সব মিলিয়ে ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকার পরীক্ষার খরচ হতে পারে।

মোটামুটিভাবে, ১৫০০০ থেকে ২৫০০০ টাকার মধ্যে পিজিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সিজারিয়ান ডেলিভারি চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব, যা মানসম্মত বেসরকারি হাসপাতালে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

০৮। জরুরি অবস্থায় ভর্তি

যদি কোনো গর্ভবতী মায়ের হঠাৎ প্রসব বেদনা শুরু হয় কিংবা রক্তক্ষরণ বা অন্য কোনো জরুরি সমস্যা দেখা দেয়, তবে তাকে সরাসরি ডি ব্লকের ইমারজেন্সি বা জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে। জরুরি বিভাগ প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। সেখানে দায়িত্বরত ডাক্তাররা তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করে যদি মনে করেন দ্রুত সিজার প্রয়োজন তবে নিয়মমাফিক পদ্ধতি ছাড়াই দ্রুত জীবন রক্ষাকারী অপারেশনের কাজ শুরু করা হয়।

D Block - BMU - PG Hospital
D Block – BMU – PG Hospital

০৯। রোগীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ

হাসপাতালে থাকাকালীন দালালের খপ্পর থেকে সবসময় সাবধান থাকতে হবে। কেউ যদি আপনাকে দ্রুত বেড পাইয়ে দেওয়া বা কম খরচে টেস্ট করানোর প্রলোভন দেখায়, তবে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করুন। যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি নার্স স্টেশন বা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। রোগীর সাথে সবসময় একজন নারী এবং একজন পুরুষ এটেনডেন্ট থাকা জরুরি কারণ রক্তের প্রয়োজন হলে বা বাইরের কাজের জন্য ছুটাছুটি করতে হয়।

১০। পিজিতে চিকিৎসার গুণমান মূল্যায়ন

বিএমইউ বা পিজি হাসপাতাল মূলত একটি উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্র। এখানে প্রফসর এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সরাসরি অপারেশনের তদারকি করেন। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, রোগীদেরকে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। সঠিক গাইডলাইন এবং সঠিক তথ্যের মাধ্যমে আপনি এই উন্নত চিকিৎসাটি কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়াই গ্রহণ করতে পারেন।

সঠিক তথ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়াই সচিপ – SOCHIP এর মূল লক্ষ্য। আপনি যদি এই হাসপাতালে সিজারিয়ান চিকিৎসার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। হাসপাতালের নিয়মগুলো ফলো করে আপনি সফলভাবে নতুন অতিথিকে পৃথিবীতে স্বাগত জানাতে পারবেন।


সাথেই থাকুন,

সঠিক তথ্য সেবা কেন্দ্র।

SOCHIP – BM University Hospital

Ex BSMMU, PG Hospital


Keywords Topic – সিজারিয়ান ডেলিভারি, সিজারিয়ান সেকশন, C-section, Cesarean Section, Cesarean Delivery, Caesarean Section, Obstetric Cesarean Section, LUCS (Lower Uterine Segment Cesarean Section), Obs & Gynae, Gynecology, Obstetrics.


আপনার পরিবারের কারো উপকারের জন্য পোস্টটি শেয়ার করে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *